প্রবাসীরা কেন বেশিদিন বাঁচেন না? প্রবাসজীবনের কষ্ট, মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
ভূমিকা
প্রবাস মানেই শুধু টাকা উপার্জন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো কিংবা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়। প্রবাসজীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য কষ্ট, ত্যাগ, একাকিত্ব এবং মানসিক চাপের গল্প। পরিবারের সুখের জন্য হাজার হাজার মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। কেউ যান ইউরোপে, কেউ মধ্যপ্রাচ্যে, আবার কেউ পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে। তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থেকে কঠোর পরিশ্রম করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রবাসীরা কি সত্যিই দেশের মানুষের তুলনায় কম দিন বাঁচেন? বাস্তবে এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই যে প্রবাসীরা কম আয়ু পান। একজন মানুষের আয়ু নির্ভর করে তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক অবস্থা, জীবনযাপন, কাজের পরিবেশ, চিকিৎসার সুযোগ এবং নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে কিছু প্রবাসীর জীবনে এমন কিছু ঝুঁকি থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
১. পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। নিজের সন্তান বড় হচ্ছে, বাবা-মা বয়স্ক হচ্ছেন, পরিবারের সদস্যরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—কিন্তু প্রবাসী সব সময় তাঁদের পাশে থাকতে পারেন না।
ঈদ, জন্মদিন কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রিয়জনদের সঙ্গে থাকতে না পারার কষ্ট অনেক সময় মনের মধ্যে জমে থাকে। ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বললেও বাস্তবে পাশে থাকার অভাব পূরণ হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্ব অনুভব করলে মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রবাসীদের জন্য পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
২. অতিরিক্ত কাজ ও শারীরিক পরিশ্রম
অনেক প্রবাসী জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করেন। নির্মাণকাজ, কারখানা, রেস্টুরেন্ট, পরিচ্ছন্নতাকর্ম, কৃষিকাজ কিংবা ডেলিভারির মতো পেশায় শারীরিক পরিশ্রম বেশি হতে পারে।
কেউ কেউ আর্থিক চাপের কারণে পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়েই অতিরিক্ত সময় কাজ করেন। দিনের পর দিন এমন জীবনযাপন করলে শরীরে ক্লান্তি জমতে পারে এবং পেশি, হাড় ও জোড়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কাজের পরিবেশে নিরাপত্তার অভাব, অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা, ভারী জিনিস বহন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই নিয়মিত বিশ্রাম, নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৩. মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
প্রবাসীদের জীবনে আর্থিক দুশ্চিন্তা একটি বড় বিষয়। দেশে টাকা পাঠানো, পরিবারের খরচ চালানো, ঋণ পরিশোধ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার চিন্তা অনেকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
কখনো চাকরি হারানোর ভয়, কখনো ভিসা বা বসবাসের অনুমতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, আবার কখনো পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার আশঙ্কা তাঁদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক রকম হয় না।
মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা মনে করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
৪. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
অনেক প্রবাসী শিফট অনুযায়ী কাজ করেন। কারও কাজ শুরু হয় খুব ভোরে, আবার কারও কাজ শেষ হয় গভীর রাতে। এর ফলে নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। মনোযোগ কমে যেতে পারে, কাজে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত প্রতি রাতে প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন কিছুটা আলাদা হতে পারে।
প্রবাসীদের উচিত ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা, ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং সম্ভব হলে শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া।
৫. অস্বাস্থ্যকর খাবার ও অনিয়মিত জীবনযাপন
বিদেশে ব্যস্ততার কারণে অনেক প্রবাসী নিয়মিত রান্না করতে পারেন না। ফলে ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার কিংবা সহজে পাওয়া যায় এমন প্রস্তুত খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
কেউ কেউ কাজের চাপে সময়মতো খাবার খান না, পর্যাপ্ত পানি পান করেন না কিংবা ফলমূল ও শাকসবজি কম খান। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস বজায় থাকলে পুষ্টির ঘাটতি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে।
সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম, মাছ কিংবা অন্যান্য উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা ভালো। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা প্রয়োজন।
৬. চিকিৎসা নিতে দেরি করা
কিছু প্রবাসী অর্থের অভাব, কাজ থেকে ছুটি না পাওয়া, ভাষাগত সমস্যা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার নিয়ম না জানার কারণে অসুস্থ হলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন।
অনেকে মনে করেন, সামান্য ব্যথা বা অসুস্থতা কয়েক দিন পর এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু রোগের ক্ষেত্রে দেরি করলে সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে।
যে দেশে বসবাস করছেন, সেখানে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার নিয়ম, স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
৭. একাকিত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের অভাব
প্রবাসে অনেকেই নিজের পরিচিত মানুষদের ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে বসবাস শুরু করেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের পার্থক্যের কারণে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাও কঠিন হতে পারে।
কাজ আর বাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবন অনেক সময় মানুষকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষ না থাকলে মানসিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
এ সমস্যা কমাতে নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, স্থানীয় সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর বন্ধুত্ব গড়ে তোলা সহায়ক হতে পারে।
তবে প্রত্যেক মানুষের সামাজিক চাহিদা আলাদা। নিজের জন্য স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ সম্পর্ক তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৮. আবহাওয়া ও কাজের পরিবেশ
বিদেশের আবহাওয়া অনেক সময় বাংলাদেশের আবহাওয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়। প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুষারপাত, অতিরিক্ত গরম কিংবা আর্দ্র পরিবেশে কাজ করা শারীরিকভাবে কঠিন হতে পারে।
বিশেষ করে পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া প্রচণ্ড ঠান্ডা বা গরমে কাজ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। একইভাবে ধুলাবালি, রাসায়নিক পদার্থ, অতিরিক্ত শব্দ এবং বায়ুদূষণের সংস্পর্শেও কিছু পেশার কর্মীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
কাজের পরিবেশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, উপযুক্ত পোশাক পরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিয়োগকর্তাকে জানানো জরুরি।
৯. পরিবারের জন্য সবকিছু ত্যাগ করার মানসিকতা
অনেক প্রবাসী নিজের প্রয়োজনের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেন। নিজের চিকিৎসা, বিশ্রাম, ভালো খাবার কিংবা ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধা করেন। তাঁদের চিন্তা থাকে, দেশে যেন পরিবারের কোনো অভাব না হয়।
পরিবারের জন্য ত্যাগ করা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা শেষ পর্যন্ত নিজের এবং পরিবারের উভয়ের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, সুস্থ থাকা কোনো বিলাসিতা নয়। প্রবাসীর নিজের জীবন, স্বপ্ন এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১০. প্রবাসীরা কীভাবে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন?
প্রবাসজীবনের সব সমস্যা দূর করা সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের চেষ্টা করুন।
পুষ্টিকর খাবার খান এবং নিয়মিত পানি পান করুন।
সম্ভব হলে প্রতিদিন হাঁটা বা উপযুক্ত শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নিন।
দীর্ঘ সময় কাজ করলে নিরাপদ বিরতি নিন এবং কর্মক্ষেত্রের নিয়ম মেনে চলুন।
অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
মানসিক চাপ বেশি হলে বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা পেশাদার সহায়তা নিন।
আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা করুন, যাতে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ কমানো যায়।
নিজের বসবাসের দেশের স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করবেন না।
উপসংহার
প্রবাসীরা কেন বেশিদিন বাঁচেন না—এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। সব প্রবাসীর আয়ু কম, এমন ধারণার পক্ষে সার্বজনীন প্রমাণ নেই। তবে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ, একাকিত্ব, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করার মতো বিষয় কিছু প্রবাসীর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রবাসীরা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তাঁরাও একজন মানুষ, যাঁদের বিশ্রাম, ভালোবাসা, চিকিৎসা এবং মানসিক শান্তি প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদেরও উচিত প্রবাসীর কাছ থেকে শুধু টাকা আশা না করে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া।
মনে রাখতে হবে, জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সুস্থ শরীর ও শান্ত মন ছাড়া সেই অর্থের আনন্দ উপভোগ করা কঠিন। তাই প্রবাসীদের জীবনে কাজের পাশাপাশি নিজের যত্ন, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পরিবারের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজের জীবনটাকেও সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
Reviewed by NINDOOK LIFE
on
October 24, 2026
Rating:

No comments: